সামাজিক বাতিক ও মধ্যবিত্ত

পৃথিবী হয়তো অচিরেই আবার ঘুরে দাঁড়াবে। মানুষকে মৌলিক প্রয়োজনেই কর্মব্যস্ত করে রাখবে কিন্তু করোনা ভাইরাসের আক্রমণের এই ক্ষত চিহ্ন আগামী ছয় বছরেও পূরণ হবে কিনা সন্দেহ।

অকালে অভিভাবক হারানো অনেকেই ক্ষতচিহ্ন নিয়ে কাতরাবে বহু বছর কিন্তু ক্ষত চিহ্ন মুছে দেওয়ার অয়েন্টমেন্ট হয়তো বিশ্ববাজারে খুজে পাবেনা। যে সকল পরিবার তার উপার্জনক্ষম একমাত্র অভিভাবককে হারিয়েছে, তার বিকল্প তৈরি হতে হয়তো বহু বছর সময় লাগবে কিন্তু ততদিনে বৈরী পরিবেশ ও অভাববোধের সাথে টিকে থাকতে পারাটাই চ্যালেঞ্জের একটি বিষয়। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছে অসংখ্য কর্মক্ষেত্র।

নতুন উদ্দ্যমে পূনরায় শুরু হওয়ার বিষয়টি বিশ্ব পরিস্থিতি নির্ভর। কর্মক্ষম কোটি কোটি হাত বেকারত্ব নিয়ে বিকল্প ব্যবস্থায় নিজকে টিকিয়ে ব্যর্থ চেষ্টায় নিয়োজিত রেখেছে। নতুনভাবে নিজকে কর্মক্ষেত্রে জড়িয়ে নেওয়ার আশায় স্বপ্নের ভেলায় ভেসে প্রতিদিনই পার করছে অসংখ্য কর্মঘন্টা। প্রচন্ড ইচ্ছাশক্তি নিয়ে প্রতিদিন বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে গমনাগমন করলেও মলিন মুখে ফিরতে হচ্ছে নীড়ে। যোগ্যতার মানদণ্ডের বিচারে যুতসই কর্মের অভাবে নিজকে কর্মহীন রাখতে বাধ্য হচ্ছে অসংখ্য মানুষ। বিশ্বের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় একমুহূর্তে নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ নেই। ছয় মাসের লকডাউনে জমানো অর্থ বা অন্যের থেকে ধারকরা অর্থ দিয়ে পরিবারের সদস্যদের মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দিতে পারলেও বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি না হওয়ায় অনেকেই শহরের বাসা ছেড়ে পরিবারের সদস্যদের গ্রামে পাঠিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে।

গ্রামে পাঠিয়ে বাসাভাড়া থেকে মাফ পেলেও পরিবারের সদস্যদের নিত্য খরচের অর্থের জোগান দিতে মরিয়া নিন্ম মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেনীর অসংখ্য মানুষ। মেধাবী সন্তানদের নিয়ে ভবিষ্যতের ভাবনা এখন ভংগুরপ্রায়। সবই আকস্মিক উত্থান পতন। এই আকস্মিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়তো কেউই প্রস্তুত ছিলোনা। তবুও বাচতে হচ্ছে শুধু জীবন নামের প্রিয় শব্দটাকে সার্থক করার দায়বদ্ধতা নিয়ে। আগামী একবছরেও হয়তো সুযোগ হচ্ছেনা উল্লেখযোগ্য কর্মক্ষেত্রের। কারণ করোনা মহামারিতে বন্ধ হয়ে যাওয়া সহস্র কারখানা ও কর্পোরেট খাত এখন বিশ্রাম নিচ্ছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো আমাদের দেশের পন্যের ক্রেতা এবং বাজারজাত কারী দেশ।

তাদের সচলায়তনের উপর নির্ভরশীল আমাদের বাংলাদেশের ব্যবসা বানিজ্যের প্রসার বিধায় বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো সহজে তার প্রাণ ফিরে পাবে বলে চলমাণ পরিস্থিতি বলেনা। নতুন কর্মক্ষেত্রের কথা বাদই দিলাম কিন্তু যারা কর্মক্ষেত্রে বহাল ছিলো, তাদের পরিবার কি অবস্থার মুখোমুখি হচ্ছে তা নিয়েই মাথাব্যথা। মধ্যবিত্তরা একটু সুখের ছোয়া পেলেও সুখকে আলিঙ্গন করার ভাগ্য তাদের সুপ্রসন্ন নয়। প্রান্তিক মানুষগুলো যখন যে কর্ম পায়, তা নিয়ে হয়তো জীবনের সাথে যুদ্ধ করে বাচার স্বপ্ন দেখছে কিন্তু মধ্যবিত্তের জন্য সামাজিক লৌকিকতার বিচারে নিন্মমাণের সমস্ত কাজের জন্য অন্তরায় বিধায় না পারবে নীচে নামতে, না পারবে ক্ষুধার্ত পাকস্থলীতে দুমুঠো অন্ন দিতে। এটাই বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর সামাজিক ব্যাধি।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সামাজিক মর্যাদা নির্ভরতায় কর্মের মানভেদে যেমন বিন্যাস নেই, ঠিক কোন কর্মকেও ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কর্মই তাদের কাছে ধর্ম বলে বিশ্বাস করে। অথচ আমরাই একমাত্র জাতি, যারা কর্মের ক্রাইটেরিয়া নির্ভরতায় মানুষের মূল্যায়ন ও সোস্যাল ডিগনিটির অনাভিধানিক শ্রেণী বিন্যাসের জন্ম দিতে শিখেছি। জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে মানুষ স্বীকৃত যে কোন কর্ম করতে প্রস্তুত থাকলেও সমাজব্যবস্থার কথিত মর্যাদার রশি আমাদের কোমরে বেধে দিয়েছে। চলমান এই পরিস্থিতি থেকে সামাজিক মর্যাদা বিষয়ক কথিত এই নোংরা সৃংস্কৃতির অবসান হওয়া দরকার।

সামাজিক মর্যাদার ম্যানিয়া ক্ষুধার্ত পেটের পাশাপাশি অন্তরে লালন করলেও অদৃশ্য এই শব্দটি এখন অন্নের সন্ধান দিতে আমাদের পাশে নেই বিধায় নোংরা সমাজব্যবস্থার কথা ভুলে গিয়ে কর্মকে মূল্যায়ন করার এবং সামাজিক স্বীকৃতি দিতে অঙ্গীকারাবদ্ধ হই। কর্মের শ্রেণী বিন্যাস ও মানুষের মর্যাদার শ্রেণী বিন্যাস আজ আমাদের এই পরিস্থিতির মুখোমুখি করতে বাধ্য করেছে। মানুষের সামাজিক মর্যাদা থেকে কর্ম নির্ভরতায় প্রকৃত স্বীকৃতি দেওয়া উচিৎ।

সামাজিক বেড়াজাল নয়, সকল স্বীকৃত কর্মকেই প্রাধান্য দিয়ে জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনীয় কোষগুলো সচল রাখতে উদ্দুদ্ধ হলে অন্তত দুমুঠো অন্নের ভাগ্যবরণ করা সম্ভব হবে। সামাজিক লৌকিকতা নির্ভর বিষফোঁড়া অন্তরে লালন করলে জীবন ও জীবিকার সুক্ষ পথগুলো বন্ধুর হয়ে উঠবে বিধায় স্বীকৃত যে কোন কর্মযজ্ঞকে অবহেলা না করাই উত্তম। আল্লাহ সকলকে সুরক্ষিত রাখুক।

লেখক: মোস্তাফিজুর রহমান। গোপালগঞ্জ। তারিখঃ ২০/০৭/২০২০ .