সমান্তরাল

সেলিম মোহাম্মেদ

উফফ– এই সেপ্টেম্বরেও কী গরমটাই না পড়ছে! আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী আরো টানা এক সপ্তাহ এ অবস্থা-ই চলবে। এই মুহূর্তে খুব বেশি হলে তাপমাত্রা থাকার কথা ১৫ থেকে ১৮ ডিগ্রী, আর গত এক সপ্তাহ যাবৎ চলছে ২৮ থেকে ৩৩ ডিগ্রী, আর সহ্য হচ্ছে না, তাই বড় একটি গ্লাসে বরফ সহ আধা লিটার ঠান্ডা পানি নিয়ে বসেছি, কারণ কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রভা ফোন করবে- বলতে বলতেই ফোন বেজে উঠলো।

হ্যালো প্রভা-
কেমন আছো শুভ? সে কথা আর জানতে চেওনা গরমে সিদ্ধ হয়ে যাচ্ছি।
বলো কী? দেশে চলছে ভাদ্র মাস আর তুমি ইউরোপে বসে গরমে সিদ্ধ হয়ে যাচ্ছো?
এই হলো তোমার সাথে কথা বলার সমস্যা, ভাদ্র মাসের কথা বলে তুমি মনে করিয়ে দিলে একটি বিশেষ প্রাণীর কথা, এখন সে ব্যপারে কথা বলতে গেলে আসল কথাটাই আর বলা হবেনা!
আচ্ছা ভাদ্র মাস ছেড়ে এবার বলো কী বলতে চাচ্ছিলে আজ?
ইচ্ছে ছিলো কথা বলবো ৮২’ থেকে ৯০’ পর্যন্ত স্বৈরাচার পতনে ছাত্র আন্দোলনে তোমাদের আমাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে, এখন ভাবছি গত সপ্তাহে যে তোমরা ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলকে বিদায় করে দিলে দ্বিমত পোষণ করার জন্য, এটাতো স্বৈরাচারী আচরণের চেয়েও বেশি! এখন তুমি কী বলবে?

যে লোক একজন সুদখোরকে সাপোর্ট করে, তাঁকে সরিয়ে দেয়াটা কি খুব খারাপ হয়েছে শুভ?
আচ্ছা প্রভা আমাকে এমন একটা ব্যাংক দেখাতে পারবে যে সুদ নেয় না?
না- সুদ সবাই নেয় কিন্তু তাঁর সুদের হার ছিল অনেক বেশি।
তাঁর সুদের হার যদি বেশি-ই হয়ে থাকে, তাহলে মানুষ তাঁর কাছ থেকে টাকা ধার না নিলেই তো হয়, সে কি জোর করে মানুষকে টাকা ধার নিতে বলেছে?

শুভ তুমি যা-ই বলো না কেন, ঐ ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলের উচিত হয়নি ডঃ ইউনুসকে সাপোর্ট করা।
বন্ধু এখানেই তোমাদের সমস্যাটা।
সব সরকারের সময়েই এমন অনেক কিছু হয়েছে, এখন তুমি আমাদেরকেই শুধু দোষারোপ করছো।

এটাও ঠিক বললে না প্রভা। তোমাকে একটা উদাহরণ দিচ্ছি। ৯১’ তে যখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায়, তখন জাহানারা ইমামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করেছিল সরকার। তখন আ্যটর্নি জেনারেল ছিলেন আমিনুল হক সাহেব, সে সময় জাহানারা ইমামের বিরুদ্ধে তিনি কোর্টে দাঁড়াতে অস্বীকৃতি জানান, সেদিন কিন্তু সরকার তাঁর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি! কারণ এটা ছিল আমিনুল হক সাহেবের মৌলিক অধিকার।

আচ্ছা শুভ গত পরশুদিন যে তিনজন ছাত্র নেতাকে পুলিশ ধরে নিয়ে শারীরিক ভাবে অত্যাচার করলো, এটা নিশ্চয়ই ভালো করেনি? এই অপরাধে পুলিশ অফিসার হারুনকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে, এটাও কি সরকার ভুল করেছে?

হ্যা আবার না, এতো বড় অপরাধের জন্য শুধু সরিয়ে দেয়া কোন বিচার হতে পারে না। যে কোন মানুষকে ধরে নিয়ে এভাবে অত্যাচার করাকে কোন ভাবেই ক্ষমা করা উচিত নয়, তবে সেটা হওয়া উচিত প্রত্যেকের বেলা। অতীতে এমন অমার্জনীয় অপরাধ করার পর রাষ্ট্রীয় পদক দিয়েছে অন্য হারুনকে মনে পড়ে? তাই আজ আরো নতুন নতুন হারুন বের হয়ে আসছে। তুমি যে ভাবেই বলো বন্ধু কর্মের ফল তোমাকে ভোগ করতেই হবে, আজ নয়তো কাল।

আচ্ছা এতোক্ষণ তো আমাদের সরকারের ভুলের কথা-ই বললে, তাঁর আগের সরকার কি কোন ভুল করেনি?

অবশ্যই এরশাদ সরকার বিএনপি সরকার কেউ ভুলের উর্ধ্বে নয়। এরশাদ সরকার তো তাঁদের ভুলের মাশুল নব্বইতে দিয়েছে। আর বিএনপি সরকার তাঁদের ভুলের মাশুল এখন দিচ্ছে। বিএনপি সরকারের বড় ভুলের মধ্যে একটি ছিল মহিউদ্দিন খান আলমগীরের বিচার না করা। সেদিন তাঁর বিচারটা শক্ত হাতে করলে আমলারা এতোটা বেসামাল হতে পারতো না। ম খা আলমগীর নিজে একজন অপরাধী বলেই সে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী থাকা অবস্থায়, আজকের ডিবির হারুন বিরোধী দলের চিফ হুইপকে রাস্তায় পিটিয়েছে, বিনিময়ে ম খা আলমগীর হারুনকে রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে পুরুস্কৃত করেছে তোমার মনে আছে নিশ্চয়ই?

শুভ ম খা কিন্তু একজন জাঁদরেল সচিব ছিলো, মন্ত্রী ছিলো এখনো এম পি, তাঁর ব্যপারে এভাবে কথা বলা কি ঠিক হচ্ছে?তা ছাড়া সে তোমাদের এলাকার মানুষ, একটু ছাড় দেয়া যায় না?

এটা আমাদের এলাকার লোক বলে বলছো, নাকি তোমাদের দলীয় লোক বলে বলছো? তোমার কথা শুনে একটা গল্প মনে পড়ে গেল তোমাকে বলছি গল্পটা।” এক বুড়ো চাচা ডিম বিক্রি করছিল রাস্তার দাড়িয়ে, ক্রেতাকে দেয়ার সময় হালি তিনটা করে গুনে দিচ্ছিল, ক্রেতা বললো চাচা এক হালি তো চারটায় আপনি তিনটা করে গুনছেন কেনো? চাচা বলে বাবা ভাদ্র মাসের গরমে মাথা ঠিক কাজ করছে না, তাই ভুল করে ফেলেছি। ক্রেতা জবাবে বললো চাচা মাথা যেহেতু কাজ করছেনা, তো তিনটার পরিবর্তে পাঁচটা করে দিচ্ছেন না কেনো? চাচা বলে বাবা অতোটা খারাপ হয়নি”। তোমাদের অবস্থা ঐ চাচার মতোই অনেকটা।

আচ্ছা শুভ অনেক কথা হলো আজ আগামী সপ্তাহে আবার কথা হবে।

প্রভা তুমি আমি একসাথে জীবনের অনেকটা পথ তো পাড়ি দিয়ে এলাম, চলেছি পাশাপাশি সবসময় কিন্তু এক হতে পারিনি, তাই আজকের মতো বিদায় নেবো একটি বিখ্যাত গান শুনতে শুনতে। আগামী সপ্তাহে আবার কথা হবে, ভালো থেকো ততক্ষণ।
গান
দুই ভুবনের দুই বাসিন্দা বন্ধু চিরকাল
রেললাইন বহে সমান্তরাল
বহে সমান্তরাল…।।
পিরিতের ঘর বানাইয়া অন্তরের ভিতর…
দুই দিগন্তে রইলাম দুইজন
সারা জীবন ভর….।।
হইলো না তো সুখের মিলন
হইলো না শুকসারির দর্শন
এমনই কপাল।।
নয়নের জল শুকাইয়া বিচ্ছেদের অনল…
এই অন্তরে অন্তর জ্বালা বাড়াইলো কেবল
হইলো না তো মিলন সাধন
চিনলো না মন মনের বান্ধন
এমনই আড়াল… চলবে। পর্ব -২

সেলিম মোহাম্মেদ, লন্ডন ইউ কে