সমান্তরাল

সেলিম মোহাম্মেদ

শুভ’র মনটা আজ খুবই খারাপ, অফিস কলিগদের সামনে বেশ লজ্জায় পড়তে হয়েছে, কারণ মাতৃভূমির উপর আমেরিকার ভিসা স্যাংশন। জীবনে কোনদিনই শুভ আমেরিকা প্রেমী ছিলনা, তারপর আবার নিজ দেশের উপর ভিসা স্যাংশন, যেখানে এই মুহূর্তে তাঁর মনে আমেরিকার প্রতি প্রচন্ড ঘৃনা আর ক্ষোভ তৈরি হওয়ার কথা, সেখানে আজ তাঁর মনে প্রচন্ড ক্ষোভ আর ঘৃণা হচ্ছে নিজ দেশের ঐসব মানুষদের প্রতি,যাদের কর্মফল হিসেবে পুরো জাতির কপালে এঁকে দেয়া হয়েছে এই কলঙ্ক তিলক। তাই সকাল থেকেই ভাবছে, আচ্ছা প্রভা আবার এই ভিসা নিষেধাজ্ঞায় পরেনি তো? ঠিক সে সময় এলো প্রভার ফোন।

⭐ কেমন আছো প্রভা?
⭐ ভালো আছি, তুমি কেমন আছো?
⭐ চলে যাচ্ছে-তবে মনটা ভালো নেই, জাতির ললাটে আমেরিকা যে কলঙ্ক তিলক এঁকে দিয়েছে, মন ভালো থাকে কিভাবে বলো?
⭐ আরে এতে আবার চিন্তার কি আছে? আমরা আমেরিকা যাবো না!
⭐ আরে ভাই আমেরিকা যাবে না ভালো কথা, কিন্তু ভিসা নিষেধাজ্ঞাটা যে অপমানজনক আর লজ্জার, দলান্ধতার কারণে সে অনুভূতিটাও হারিয়ে ফেলেছো?
⭐ না শুভ অনুভূতি আমি হারাইনি হারিয়েছ তুমি এবং তোমাদের মতো কিছু মানুষ, যে আমেরিকা আমাদের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে,আজ তোমরা সেই আমেরিকার পক্ষে কথা বলছো, তোমার এমন আচরণে আমি লজ্জিত।
⭐ যাক লজ্জা নামক শব্দটি তাহলে তোমার মনে আছে! আমি তো ভেবেছিলাম এই শব্দটি তোমাদের অভিধান থেকে হারিয়ে গেছে। বন্ধু যে আমেরিকাকে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি বলছো সে কিন্তু এই ভিসা নিষেধাজ্ঞাটা দিয়েছে বাঙ্গালী জাতির ভোটাধিকার এবং বাকস্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার জন্য। এই সেই আমেরিকা যে ৭১’এর পর থেকে এই পর্যন্ত বাংলাদেশকে শুধু অফেরত যোগ্য সাহায্য দিয়েছে দশ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি, যা তোমাদের বন্ধু চীন, রাশিয়া আর ভারত মিলে তার এক তৃতীয়াংশও দেয়নি।
⭐ আচ্ছা শুভ আমরা যদি তাঁদের দেশে না যাই, তাহলে তাঁদের দেয়া এই ভিসা নিষেধাজ্ঞার ফলাফল কি হবে?


⭐ বন্ধু এই ভিসা নিষেধাজ্ঞার ছোবল যে কতটা বিষাক্ত তা তোমরা অনুধাবন করতে পারোনি এখনো। এতো দিন দেশের মানুষকে উন্নয়নের গল্প শুনাতে গিয়ে বলেছ, আমরা সিঙ্গাপুর হয়ে গেছি কয়েক বছরের মধ্যেই কানাডাকে পেছনে ফেলে আমরা এগিয়ে যাবো,আরো কতো কি।এখন এই ভিসা নিষেধাজ্ঞা আমাদেরকে নিয়ে গেছে নাইজেরিয়া, আফগানিস্তান, হাইতি, সুদান, নিকারাগুয়া ও বেলারুশের পাশে।


⭐ ভিসা নিষেধাজ্ঞা ওদের যেমন কিছু করতে পারেনি, আমাদেরও কিছু করতে পারবেনা।
⭐ না বন্ধু ওদের অনেক ক্ষতি হয়েছে এবং হচ্ছে, ওদের চেয়ে আমাদের ক্ষতি আরো বেশি হবে। আমরা আমদানি নির্ভর একটা দেশ, আমাদের রপ্তানি যা করি তার প্রায় সবটুকু যায় আমেরিকা আর ইউরোপে, আর বাকি ডলার আয় হয় আদমের খাত থেকে, তা-ও আবার মধ্যপ্রাচ্য ইউরোপ এবং আমেরিকা থেকেই, সেই আয় করা ডলার দিয়েই আমরা রাশিয়া, চায়না এবং ভারত থেকে পণ্য সামগ্রী আমদানি করি। ভারত, রাশিয়া আর চীনের কাছে আমরা খরিদ্দার তাই ওদের ব্যবসার জন্য ওঁরা আমাদের পেছনে ঘুরঘুর করবে, ঠিক একই ভাবে ইউরোপ আমেরিকা যেহেতু আমাদের মূল খরিদ্দার তাই তাঁদের সাথে আমাদের সম্পর্ক রাখতে হবে ব্যবসার জন্য।
⭐ কিন্তু শুভ এই ভিসা নিষেধাজ্ঞা কি ব্যবসার ক্ষতি করতে পারবে?


⭐ অবশ্যই পারবে প্রভা, মনে করো তোমার ব্যবসা আছে আমেরিকা ইউরোপের সাথে,এমন কি আমেরিকার যে কোনো বন্ধু রাষ্ট্রের সাথেও, আর তোমার উপর আমেরিকা ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তখন আমেরিকা এবং তাঁর বন্ধু রাষ্ট্রে তোমার যে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে সেটা বন্ধ হয়ে যাবে, তুমি কোন ডলারে লেনদেন করতে পারবেনা। তোমার ছেলে মেয়ে বাহিরে যাওয়ার সুযোগ হারাবে এমনকি বহির্বিশ্বে সন্তানের পড়াশোনা করার সুযোগটাও থাকবে না। এই ভিসা নিষেধাজ্ঞা ফ্যামিলীর প্রত্যেকের জন্য প্রযোজ্য, যাকে বলে একজন পাপ করে দশ জন পুড়ে মরে।


⭐ যাক ভাই আমার ব্যবসাও নেই সন্তানরাও দেশের বাহিরে থাকে না, অতএব “নো চিন্তা ডু ফুর্তি”
⭐ আবারো ভুল বলছো, ব্যবসায়ী না হলেও লিস্টের প্রথমেই আছো তুমি আর তোমার সাহেব।
⭐ না শুভ- এখন কিন্তু তুমি আমাকে শুধু শুধু ভয় দেখাচ্ছ! তোমাকে আমি হাঁড়ে হাঁড়ে চিনি।
⭐ কি যে বলো-না, এই ভিসা নিষেধাজ্ঞা তো তাঁদের জন্য, যারা বিনা ভোটেই ক্ষমতা দখল করে আছে, তুমি তো তাদেরই একজন, তোমাদের এই অপরাধে সহযোগিতা করেছে প্রশাসন, বিচারের নামে প্রহসন করে অনেক মানুষকে কারাগারে ঢুকিয়েছে যে বিচার বিভাগ, এভাবে এসব অপরাধের সাথে যারা জড়িত প্রত্যেকের জন্য এই ভিসা নিষেধাজ্ঞা।
⭐ আরে তুমি যতো কিছুই বলো আমাদের নেত্রী সব ঠিক করে ফেলবে।


⭐ বন্ধু যে নেত্রী নিজের সন্তানের বিষয় সম্পত্তি রক্ষা করতে পারছেনা বলে সংবাদ সম্মেলনেই বলে দিয়েছে, আমার সন্তানের ভিসা বাতিল করে যদি তাঁর সম্পত্তি আমেরিকান সরকার নিয়ে নেয় তাতে তাঁর কিছুই আসে যায় না, সে করবে তোমাদেরকে রক্ষা? ভুলে যাও বন্ধু ভুলে যাও ওসব।
⭐ তাহলে আর কি করা, এখন শামীম ওসমানের মতো জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে মক্কা গিয়ে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবো, রাজনীতিকে বা-ই বলে দেবো।


⭐ ক্ষমা চাইবে ভালো কথা, তাই বলে নিজের আসল রুপ পরিবর্তন করলে আবার বিপদও হতে পারে!
⭐ সেটা আবার কেমন?
⭐ তাহলে শুনো একটা গল্প দিয়েই আজ বিদায় নেবো।


ষাট বছর বয়সের এক মহিলা ২০০৮ সালে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে স্বপ্নে দেখে আল্লাহকে, সে তো মহাখুশি, ভাবছে আল্লাহকে যেহেতু পেয়েই গেলাম তাহলে একটু জেনে নিই আমি আর কতো বছর বাঁচবো? অতএব জানতে চাইলো, সাথে সাথে আল্লাহ বললেন তুই ২০৪১ পর্যন্ত বাঁচবি। এই কথা শুনে ভাবলো- তাহলে আর বুড়ি হয়ে বাঁচতে যাবো কেনো? টাকার তো আর অভাব নেই, পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো প্লাস্টিক সার্জারিয়ানদের ডাকো, মাইকেল জ্যাকসনের মতো আমাকে সার্জারি করে ২০ বছরের যুবতী বানিয়ে দাও।

যে কথা সেই কাজ, এবার হাসপাতাল থেকে বাসায় যাবে, কিন্তু বিধি বাম, হঠাৎ এক ঝড়ো হাওয়া তাঁর জীবন কেড়ে নিলো, এবার আল্লাহকে বলছে, আল্লাহ তুমি কাজটা ভালো করোনি, আমাকে বললে ২০৪১ পর্যন্ত বাঁচবো তাই জীবনের সব টাকা পয়সা খরচ করে যুবতী হলাম আর বাসায় পৌঁছার আগেই তুমি আমাকে নিয়ে এলে? আল্লাহ বললেন আরে বোকা তোর ২০০৮ এর চেহারা থাকলে তুই ২০৪১ পর্যন্তই বাঁচতে পারতি, কিন্তু তোর চেহারা পরিবর্তন করাতে আজরাইল চিনতে পারেনি তাই তোকে উঠিয়ে নিয়ে এসেছে। চলবে…. পর্ব -৩। সেলিম মোহাম্মেদ, লন্ডন ইউ কে।