শিরোনামহীন


সেলিম মোহাম্মেদ
লন্ডন, ইউ কে


গতকাল থেকে আজ পর্যন্ত মেসেঞ্জারে কয়েকবার কল এসেছে একটি অপরিচিত আইডি থেকে তাই ধরিনি, ওপার থেকে কল করে না পেয়ে মেসেজ পাঠালো। লিখা ছিল- আপনি “শুভ” হলে কলটা ধরুন প্লিজ।

এই ছোট্ট মেসেজটা দেখে এক নিমিষেই পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত বাহনে চড়ে অর্থাৎ মন ফিরে গেলো ছাত্রজীবনের সেই উত্তাল সময়ে। যখন কেউ একজন আমাকে “শুভ” নামে সম্বোধন করতো, যদিও সেই জীবনে শুভর চেয়ে অশুভ ঘটনাই ছিল নিত্য দিনের সঙ্গী, কিন্তু জীবন ছিল ঝকঝকে রঙিন, ছিল স্বপ্ন/দেশপ্রেম/প্রতিবাদী কন্ঠ/ ভালোবাসা/ক্লাস শেষে বন্ধুদের সাথে বিরতিহীন আড্ডা।

ভাবনায় ডুবে থাকা অবস্থায় কানে ভেসে এলো আবারো সেই মেসেঞ্জারে কল হচ্ছে ,রিসিভ করে আমি কিছু বলার আগেই এক নিঃশ্বাসে অনেকগুলো প্রশ্ন ভেসে এলো-
আমি জানি তুমি “শুভ”
আচ্ছা কল ধরছিলে না কেন?
কলটা ধরে একবার জানতেও তো চাইতে পারতে আমি কে? কেনো কল করছি কী চাচ্ছি?
অধৈর্য হয়ে এবার জানতে চাইলাম কে আপনি?
সাথে সাথে একটা হাসি দিয়ে বললো-
চিনতে পারোনি এখনো?
বললাম- না
আরে আমি তোমার চিরচেনা বন্ধু আর শত্রু যা-ই বলো সেই “প্রভা”।


নাম আর কথাগুলো শুনে মনে হচ্ছিল আমার পৃথিবীটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেছে।
হ্যা—-লো, শুভ চুপ করে আছো কেনো?
না- ভাবছি এখনো তুমি আগের মতোই রয়ে গেছো, যদিও এর-ই মাঝে কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে তিনটি যুগ! আচ্ছা তুমি আমাকে খুঁজে পেলে কি করে?
বন্ধু এই আন্তর্জালের যুগে কাউকে খুঁজে পাওয়া খু—-ব সহজ, আর তোমাকে খুঁজে পাওয়া তো আরো সহজ, কারণ পৃথিবীতে বন্ধু আর শত্রু কখনোই লুকিয়ে থাকতে পারে না, তোমার আমার সম্পর্ক তো বন্ধু আর শত্রু দু’টোই! আচ্ছা দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলে কেনো? দেশেও তো কিছু করতে পারতে, আমরাও তো বেঁচে আছি!


সে সুযোগ কি আর তোমরা রেখেছিলে বন্ধু? ৮২থেকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শপথ করেছিলাম স্বৈরাচারের পতন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলনের মাঠে থাকবো একসাথে, ৮৬তে সে শপথ ভুলে গিয়ে আমাদেরকে বাঘের মুখে ঠেলে দিয়ে তোমরা চলে গেলে হালুয়া রুটিতে ভাগ বসাতে। আমাদের মাঝে যারা সিংহ পুরুষ ছিল তাঁরা আন্দোলনের মাঠেই রয়ে গেলো আর আমার মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের কম সাহসী সন্তানরা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমালো, আমি তাঁদের-ই একজন। তোমরা তো এখনও ভালোই আছো সেই ৮৬’র মতো!


শু—ভ, সুযোগ পেয়েই শুরু করে দিলে?
কি শুরু করলাম? যা সত্য সেটাই তো বলছি!
আচ্ছা এসব কথা পরে হবে, এখন থেকে সপ্তাহে একবার করে আমি তোমার সাথে কথা বলবো, কী—– এই সুযোগ আর সময়টুকু দিবে তো?
অবশ্যই দেবো, তুমিই তো একটু আগে বললে তোমার সাথে আমার বন্ধু/শত্রু দু’রকমের সম্পর্কই আছে, তাই এমন একজন মানুষকে সময় না দিয়ে কি পারি? আচ্ছা এবার বলোতো আমার আসল নামটা বাদ দিয়ে আমাকে “শুভ” বলে ডাকতে কেনো?
সত্যিটা বলবো?


হ্যা আসল সত্যটাই তো জানতে চাচ্ছি!
শুনো তাহলে, এখন ছেলে মেয়ে বড় হয়ে গেছে, নিজেও বুড়ো হতে চলেছি,আগে যা বলতে পারিনি এখন বলছি। আগে তোমাকে কোনদিন বলিনি, কারণ তুমি আমি দু’জন ছিলাম দু’টো ভিন্ন রাজনৈতিক দলের আদর্শে বিশ্বাসী, তর্ক বিতর্ক আর রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কোলাহল ছিলো আমাদের নিত্যসঙ্গী, এতোসব কিছুর পরও মনের অজান্তেই মনের গহীনে তুমি একটা জায়গা দখল করে নিয়েছিলে, সে কারণেই আমি তোমাকে “শুভ” বলে ডাকতাম। “শু” মানে শুরু আর “ভ” দিয়ে ভালোবাসা, কিন্তু সে আর হলো কই? তুমি তো পালিয়েই গেলে! এবার বলো আমাকে “প্রভা” নাম দিয়েছিলে কেনো?
শুনতে চাও?


হ্যা অবশ্যই শুনতে চাই!
শুনো তাহলে –
ঝগড়া করার জন্য হলেও একজন সাথী প্রয়োজন হয়, তোমার সাথে ঝগড়া আর তর্ক বিতর্ক করে আমি একটা ভিন্ন মজা পেতাম, তারপর একটা সময় বুঝতে পারলাম আমি একটু একটু করে তোমাকে ভালোবাসতে শুরু করেছি, তোমার সাথে একদিন তর্ক বিতর্ক না হলে মনে হতো আজ কি যেনো একটা করা হয়নি! যখন থেকে বুঝতে শুরু করলাম তুমিই আমার জীবনের প্রথম ভালোবাসা, সেদিন থেকেই তোমার নাম দিয়েছি প্রভা।
ধুর কি যে বলো না, প্রভা অর্থ কি ভালোবাসা?
আরে না বোকা, আমি কি তেমনটা বলেছি? তোমার “শুভ”র যেমন একটা মানে আছে তোমার কাছে, আমার”প্রভা”র ও এমন একটা মানে আছে।
“প্র” মানে প্রথম আর “ভা” মানে ভালোবাসা, অর্থাৎ প্রথম ভালোবাসা।
ভালোই হয়েছে কেউ কাউকে আগে বলিনি, বাকি জীবনটা দু’মেরুতে বসে তর্ক বিতর্ক করেই কাটিয়ে দিতে পারবো।
তুমি কিন্তু কথা দিয়েছো সপ্তাহে একদিন কল করে কথা বলবে, এবার বলো সপ্তাহের কোন দিন কল করবে?
প্রতি মঙ্গলবার কল করবো, ঠিক আছে?
ঠিক আ—ছে তবে আবারো একটা দোটানায় ফেলে দিলে।


দোটানায় ফেললাম আবার কি করে?
ঐ যে একবার নাম দিয়েছো “শুভ” কিন্তু যেখানে গিয়েছি শুভ না হলেও অশুভের দেখা পেয়েছি সর্বত্র, এখন আবার দিন ঠিক করেছো মঙ্গলবার – আল্লাহই জানেন এই দিনে মঙ্গল হয় নাকি শুধুই অমঙ্গল বয়ে আনে!


তুমি না আগের মতোই রয়ে গেছো, সেই দুষ্টুমি সেই সোজাসাপ্টা কথা, পরিবর্তনের কোন ছোয়া-ই তোমার উপর পরেনি। আজ রাখি, ভালো থেকো।
( এভাবেই চলবে প্রতি মঙ্গলবার রাতে দু’মেরুর দু’জনের “শুভ” আর “প্রভা”র ফোনালাপ, যেখানে চলবে সমসাময়িক ঘটনাবলীর আলোচনা, চলবে খুনসুটি, বিতর্ক। পাঠকদের কাছে অনুরোধ রইলো এই লেখার একটি নাম দেয়ার জন্য। এই পর্বে আপনাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া হলো দু’জনের। ধন্যবাদ জানাতে চাই এই লেখার প্রচ্ছদ তৈরি করে দেয়া মানুষটিকে, সে আর কেউ নয়, সে হলো ছোট ভাই ‘সালেহ আকরাম মেরিন’।)