মুখোশ

— মোস্তাফিজুর রহমান–

স্বার্থের প্রশ্নে জাগতিক এই পথ খুবই পিচ্ছিল। আপনার সরলতা চড়া দামে বিক্রি হয়,আপনার সরলতার সুযোগ নেওয়ার জন্য আপনার মনের গভীরে স্থান করে নেওয়া মানুষগুলো সারাক্ষণ উদগ্রীব থাকে। যাদের সাথে আপনার শুধুমাত্র হায় হ্যালো সম্পর্ক রয়েছে, তারা কোনদিনই আপনার দুর্বলতা ও সরলতার সুযোগ নিতে আসবে না, বরং আপনি ক্ষতির সম্মুখীন হতে যাচ্ছেন এমন কোন ম্যাসেজ থাকলে বিনাস্বার্থে আপনাকে এলার্মিং করার জন্য উদগ্রীব হবে। এখন সিদ্ধান্ত নিন। আপনি কি মানুষকে এখন হৃদয়ের মনিকোঠায় স্থান দিবেন, নাকি মনের দরজার চৌকাঠে সীমাবদ্ধ করবেন।

অতীত ইতিহাসের দুর্দান্ত ও বেদনাদায়ক বিশ্বাসঘাতকতার দিকে যদি নজর দেই, তাহলে অনেক কিছুই পরিস্কার হবে কিন্তু আমরা নির্মমতা ও পরিণাম জেনেও অন্ধ বিশ্বাসে অন্যকে নিরাপদ ও বিশ্বস্ত ভাবি। এটা দোষ কিংবা অন্যায় নয়। সময় ও পরিস্থিতি বিবেচনায় এটা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির একটা রোল মাত্র। শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর নিরাপত্তা বেষ্টনিতে যারা ছিলো, যাদেরকে নিরাপদ ও আস্থাভাজন মনে করেই তিনি নির্ভয়ে সারাক্ষণ পথ চলতেন, তাদের দ্বারাই তিনি হত্যা কান্ডের শিকার হয়েছিলেন। বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আশেপাশে যারা আস্থাভাজন ছিলেন, তাদের পৈচাশিক মনোবৃত্তি ও ক্ষমতার লোভের নীরব ষড়যন্ত্রের কারণে নির্মমভাবে জীবন দিতে হয়েছিলো পুরো পরিবারের সদস্যদের। যুগ যুগান্তরে এমন বিশ্বাসঘাতক ও হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে কিন্তু ভারতবর্ষ সেই ইন্দিরা গান্ধীর অভাব এখনো পূরণ করতে পারেনি, তদ্রুপ বাংলাদেশও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো মহানায়কের শূণ্যতা পূরণ করতে পারেনি। কিছুই হয়তো থেমে নেই কিন্তু দেশ ও দেশের মানুষের জন্য তাদের দূরদর্শী ও নিঃস্বার্থ পরিকল্পনা হয়তো তাদের মতো করে কোন দিনই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবেনা।

অর্থ ও ক্ষমতার লোভ মানুষকে মনুষ্যত্ব বিসর্জন দিতে সারাক্ষণ রিপুর সাথে যুদ্ধ করে থাকে। অর্থ ও ক্ষমতালোভী মানুষগুলো ক্ষমতাধরদের পাশেই বিচরণ করে। ক্ষমতাধরদের দুর্বল ও স্পর্শকাতর সময়গুলোতে অনেকেই খন্দকার মোস্তাকের মতোই মায়াকান্না করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে মাসির ভূমিকার মাধ্যমে মনের গভীরে স্থান করে নেয়। বিশ্বাস আর আস্থার জায়গাটা পাকাপোক্ত করার প্রত্যয়ে মোক্ষম সময়ের অপেক্ষায় থেকে সহদরের মতোই রোল প্লে করার অভ্যাস এরা অন্তরের বহিঃভাগে লালন করে থাকে। পরবর্তী খারাপ সময়ের অপেক্ষায় থেকে সুযোগের সদ্ব্যবহার করাই হলো এদের আসল চরিত্র।

পদ্ধতিগত জঞ্জাল ও প্রয়োজনের তাগিদে কিছু মানুষের প্রতি একান্ত নির্ভরশীলতা আমাদের সকলকে বাধ্য করে। অসংখ্য মানুষের ভীড়ে অমানুষ চিহ্নিত করার কাজটা কিন্তু এত সহজ নয়। এই ক্ষেত্রে মানুষ হিসেবে মানুষের প্রতি সম্মান দেখানো যেমন উচিৎ, ঠিক তেমনই সারাক্ষণ পর্যবেক্ষণ মাধ্যমে রেখেই সতর্কতার সাথে একান্ত সান্নিধ্যে দান করা উচিৎ। আপনার বিশ্বাসের মাস্তুল সুউচ্চ হলেও অন্যের বিশ্বাস নিয়ে বরাবরই প্রশ্ন থেকে যায়। চলমান পরিস্থিতিতে অন্যের প্রতি নিজ আস্থার জায়গাটাকে একবারেই পরিপক্ক করার যে সূত্র আমারা অন্তরে লালন করে আসছি, তা অতীতের নির্মম ঘটনাবলীকে আমলে নিয়ে অর্ধ সন্নিবেশিত রাখাটাই যৌক্তিক। মীরজাফর আলী খানদের রক্ত এখনো অসংখ্য কথিত মানুষদের শরীরে প্রবাহিত হচ্ছে। এরাই আবার নতুন মীরজাফরদের জন্মদিয়ে কোরাম পূরণের প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছে।

প্রতিটি মানুষই কমবেশী ভুল করে থাকে কিন্তু সকলেই বিশ্বাসঘাতকতা করেনা। অনিচ্ছার ভুলগুলো সদিচ্ছা থাকলে রিকভারি দেওয়া যায় কিন্তু বিশ্বাসের অমর্যাদার অপূরণীয় ক্ষতি কোন দিনই পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। কারণ বিশ্বাসঘাতকতা শব্দটি অর্থ,ক্ষমতা ও নারীর সতীত্ব হরণ নির্ভরতায় সীমাবদ্ধ। এই তিনটি দৃশ্যমান অদৃশ্যমান বস্তুকে কেন্দ্র করেই বিশ্বাসঘাতকতার আতুরাশ্রম। মৌলিক অমৌলিক নির্ভরতায় ব্যক্তির চাহিদার বিপরীতে অর্থ,ক্ষমতা ও নারী আসক্তির বজ্জাত চরিত্রের ঘৃনিত কর্মকান্ডের প্রতিফলনের নামই বিশ্বাসঘাতকতা। এটার নিয়ন্ত্রণ শক্তি যার মধ্যে প্রবল, সে মানুষ, বাকী সব অবিকল মানুষের মতোই কথিত মানুষ। একটি মনুষ্যত্ব অন্তরে লালন করে অন্যের কল্যাণের প্রত্যয়ে, অন্যটি মনুষ্যত্বহীনতার রোগী হয়ে অভিপ্রায়ের দায়মুক্তি চায় বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে।

অনিচ্ছাকৃত ভুলেভরা মানুষের সাথে চলা নিরাপদ হলেও মনের ভীতর লুকিয়ে থাকা,পরিবারের মধ্যে লুকিয়ে থাকা, রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে লুকিয়ে থাকা, মসনদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা, নীতিনির্ধারণী ফোরামের মধ্যে মুখোশ পরে লুকিয়ে থাকা বিশ্বাসঘাতকেরা আজ সমস্ত ক্ষেত্রের উন্নয়নের জন্য অন্তরায়। এদের নিয়েই চলতে হবে জানি কিন্তু পর্যবেক্ষণের মধ্যেই সাইকেলিং করার জন্য যে পদ্ধতি অবলম্বন করা প্রয়োজন, তা ভুলে গেলে যে কোন মুহুর্তে ব্যক্তি, সমাজ, পরিবার, ইন্সটিটিউশন ও রাষ্ট্রযন্ত্র অভাবনীয় ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। অর্থাৎ মানুষ নয়, মানুষের বহুরূপী অভাবনীয় চাওয়া পাওয়ার ধরনগুলো পরিবর্তন হচ্ছে গিরগিটির মতোই। খোলস বদলে নিলেও ওরা লক্ষ্যে অটুট ও স্থীর রেখেই লোকদেখানো কর্মযজ্ঞে বিশ্বাসী।

আমরা মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান দিতে চাই, মানুষের মানবীয় গুনাবলীকে স্বীকৃতি দিতে চাই, ভুলকে শুধরে দিতে চাই কিন্তু বিশ্বাসের অমর্যাদার ধারকদের আচ করতে পারলে তাদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করার প্রবণতাকে অন্তরে লালন না করি, তাহলেই ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রযন্ত্র কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছে যাবে বলে বিশ্বাস করি।

লেখক : মোস্তাফিজুর রহমান।
গোপালগঞ্জ।
তারিখঃ ১৫/০৭/২০২০ ইং.