প্রজ্ঞায়ই পরিবর্তন

— মোস্তাফিজুর রহমান—

মানুষের বহুমাত্রিক রূপ ও অত্যাচারে দীর্ঘদিন যাবত পৃথিবী বড় ক্লান্তি অনুভব করেছিলো, প্রকৃতি তার আপন স্বত্ত্বা হারিয়ে ফেলেছিলো, মুখোশবৃত্তির চাপে মানুষ আর অমানুষের পার্থক্য করার সিস্টেম কল্যাপ্স হয়ে গিয়েছিলো, আদর্শিক উর্দির চাপে অন্তরে লালিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আর সুবিধাবাদীর ফারাক করতে উষ্ঠা খেতে-খেতে পথ চলতে হচ্ছিলো, ধর্ম আর ধর্মান্ধের যাতাকলে পড়ে সাধারণ মানুষ সরল পথ থেকে ছিটকে পড়েছিলো, ধর্মের লেবাজ গায়ে লাগিয়ে পৈচাশিক বলৎকারের শিকার হয়ে নিরীহ নিস্পাপ শিশুরা গুমরে গুমরে কাদছিলো, ধর্মের ভিন্নতায় উদগ্রীব হয়ে জাতিভেদে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠার অপেক্ষায় ছিলো, শিক্ষাগুরুর হাতের লাঠিটা শিক্ষার্থীর দখলে গিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার বারটা বাজার উপক্রম হয়েছিলো, অর্থের লোভে মানুষ রক্তের বাধন ছিড়ে যাচ্ছেতাই নির্মমতায় লিপ্ত হয়েছিলো, কিছুক্ষেত্রে পারিবারিক জীবনে নারীর রক্তচক্ষুর শাষণে পুরুষ ঘরের কোনের কুনো ব্যাঙের মতোই ঘাপটি মেরে ছিলো, দূর্ণীতি আর নীতির ফুলঝুরিতে আসল নকল চেনার সূত্র বারবার মিথ্যা প্রমাণ হচ্ছিলো, অথচ মানুষ মানুষের জায়গায়ই ছিলো কিন্তু মৌলিকতা বিবর্জিত কর্মকান্ডের সাথে মানুষের সখ্যতার ফলাফলে পৃথিবীটা কেন যেন বারবার মানুষের দিকেই অভিশাপের আঙ্গুল তুলতে বাধ্য হয়েছিলো। সবই পাপাচার।

নির্মমতার অবসান কিছু ধ্বংসের মাধ্যমে পাপাচারের বহিঃপ্রকাশে প্রায়শ্চিত্ত হয়। প্যানডেমিক করোনা ভাইরাস ইস্যুতে অগণিত মানুষের জীবন কেড়ে নিয়ে পৃথিবী কিছুটা শান্ত, বিশুদ্ধ অক্সিজেনের প্রতুলতায় মানুষ এখন সজীব নিঃশ্বাস নিতে পারছে, এয়ার পলুশনের আধিক্য না থাকায় প্রকৃতির বাহারি রূপ পরিলক্ষিত হচ্ছে, বিভিন্ন ধর্মের যাজকেরা এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর রহমত লাভের জন্য চিৎকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেছে, পরাশক্তির অধিকারী দেশগুলো মানবসৃষ্ট ক্ষমতার প্রতি আস্থা হারিয়েছে, আল্লাহর ইশারার কাছে মেডিক্যাল সায়েন্স হার মানতে বাধ্য হয়েছে, রাজনৈতিক গুরুরা নড়েচড়ে বসায় রাজনীতিতে ফিল্টারিং এর আভাস পাওয়া যাচ্ছে, খুলে যাচ্ছে মুখোশ, দূর্ণীতির মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের দায়ে ও মানুষের জীবন নিয়ে ভয়ংকর খেলায় মেতে উঠার অপরাধে ক্রমান্বয়ে দৃশ্যমাণ শাস্তি ভোগ করার বিধান জনসম্মুখে আসায় মানুষ দূর্ণীতিকে না বলার প্রজ্ঞায় রিহার্সেল করছে, রাজনৈতিক পদপদবীর পোস্টমর্টেম হচ্ছে মুহুর্তেই, মানুষ ক্রমশ আস্থাশীল হচ্ছে দেশের সরকারের কার্যকর পদক্ষেপে। হাতেগোনা এই পরিবর্তন দিয়ে হয়তো পুরো দেশকে রাতারাতি পাল্টে ফেলা সম্ভব নয়, সমস্ত অপচর্চাকে হয়তো অল্প সময়ের ব্যবধানে সমাধিস্থ করা সম্ভব নয়, তবে মানুষের মনে আশার সঞ্চার হচ্ছে যে, পৃথিবী যেমন মুহুর্তেই অবরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলো, ঠিক মুহুর্তে না হলেও মানুষ তার খোলস বদলে নিয়ে সময়ের ব্যবধানে মৌলিকতায় ফিরে আসবে।

মানব সভ্যতায় যুগেযুগে মানুষের সাথেই অমানুষের বসবাস ছিলো। পাচ দশক পূর্বে অমানুষের সংখ্যা কম থাকায় মানুষ হয়রানির শিকার কম হতো এবং আল্লাহর অসীম রহমত মানুষকে নিরাপদ রাখতো। বর্তমানে অধিকাংশ মানুষ লোভ,ক্ষোভ, লালসা ও ক্ষমতা প্রাপ্তির ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মনুষ্যত্ব বিলিয়ে দিয়েছে। করোনা ভাইরাসের এই আকস্মিক আক্রমণে বিশ্বের অনেক দেশের মানুষের চরিত্রের হয়তো আমূল পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ কি পারবে তাদের মোহ আক্রান্ত বিবেককে মৌলিকতায় রূপায়ণ করতে! হয়তো সম্ভব! যদি প্রতিটি ইন্সটিটিউশনের কর্ণধাররা নিজেদের সততা ও নিষ্ঠা দিয়ে দেশের সার্বিক স্বার্থে আত্ননিয়োগ করতে উদ্দুদ্ধ হয়, যদি রাজনৈতিক দলগুলো বাস্তবে আদর্শ ফিরিয়ে আনার প্রজ্ঞায় মনোনিবেশ করে, যদি আদর্শিক ও ত্যাগী মানুষগুলোর সর্বক্ষেত্রে মূল্যায়নের সুযোগ পায়, যদি ধর্মযাজকদের কাছে ধর্মের পবিত্রতা অক্ষুণ্ন রাখতে বদ্ধপরিকর হয়, যদি প্রতিটি অভিভাবক পূণরায় দায়িত্বশীল ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে সন্তানের ভালমন্দের শাষন করার অধিকার ফিরে পায়। বহু বছর পর প্রকৃতির এই বাহারি রূপের কথা যদি বিবেচনায় নেই, তাহলে বিশ্বাসের স্তম্ভটা হয়তো আমাদের মজবুত ও আস্থাশীল হবে।

প্রকৃতির প্রতি মানুষের অত্যাচার ও কার্বন নির্গমন পাচ মাস বন্ধ থাকায় যদি প্রকৃতি তার আসল রূপে ফিরে এসে মানুষের জন্য বিশুদ্ধ অক্সিজেন উপহার দেওয়ার সক্ষমতা রাখে, তাহলে মানুষ তার লেবাজী রূপ পাল্টে মৌলিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটালে প্রকৃতির ন্যায় পাচ মাসে না হলেও পাচ বছরে দেশ ও দেশের মানুষ সার্বিক মৌলিক অধিকার ফিরে পাবে বলে প্রতীয়মান। আসুন আমরা মুখোশ খুলে পাল্টে যাই, মনুষ্যত্ব অন্তরে লালন করি। তাহলেই দেশ ও দেশের মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে সুযোগ পাবে।

লেখক: মোস্তাফিজুর রহমান। গোপালগঞ্জ। ১৭ জুলাই ২০২০.