জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে আমরা

জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে আমরা

—–মোস্তাফিজুর রহমান—-

মনুষ্যর অত্যাচার ও মনুষ্যত্বর আকালে ধরাধাম পরিশ্রান্ত ও আগ্রাসী হয়ে উঠেছে। বাসযোগ্য পৃথিবীর বিভিন্ন উপাদানের প্রতি অত্যাচার ও অপব্যবহারের মাধ্যমে ধরাধামকে আমরা বিষাক্ত করে তুলেছি বিধায় প্রকৃতির নির্মমতায় প্রতিনিয়ত আমরা চরম দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছি।

এমন কিছু দুর্যোগ মানুষের জীবনকে হঠাৎ করেই বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে, যা প্রতিহত করার জন্য মানুষের এমন সক্ষমতা তৈরি হয়নি। কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস এমন একটি দুর্যোগ, যেটার সংক্রমণের শিকার হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লক্ষলক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং এটার সংক্রমণ চলমান রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কভিড প্রতিষেধক টিকা আবিস্কার করে মানবদেহের সুরক্ষার জন্য প্রয়োগ করলেও শতভাগ সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিতে পারেনি বিধায় অনেকে টিকা নেওয়ার পরেও সংক্রমিত হচ্ছে এবং কেউকেউ মৃত্যুবরণ করছে। চিকিৎসাশাস্ত্রে কোভিড-১৯ নতুন কনছেপ্ট।

প্রতিষেধক থেকেও প্রতিহতকে অগ্রাধিকার দিয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানের আইডলেরা সচেতন থাকার জন্য নির্দেশনা প্রদান করেছে। এইক্ষেত্রে আমরা কতটা নির্দেশনা মেনে চলতে পারি বা পপুলেশনের ডেনসিটি, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও বাস্তবতা বিবেচনায় কতটুকু মেনে চলার সুযোগ রয়েছে, সেটাও কিন্তু করোনা সংক্রমণের অন্যতম কারণ। এদেশের বেশিরভাগ মানুষ স্বাস্থ্য সচেতন নয়, যা বলার অপেক্ষা রাখেনা। এছাড়াও কেউ সংক্রমণের শিকার হলে তাকে ভিন্ন কক্ষে আইসুলেট করার মতো সক্ষমতা হয়তো শতকরা আশি শতাংশ পরিবারের নেই।

অধিকিন্তু পারিবারিক মমত্ববোধ ও শিশুবাচ্চাদের বন্ডেজ ম্যানিয়ায় আমরা কেউই খুব একটা পরিবারের সদস্যদের থেকে শতভাগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো মানসিকতাও লালন করিনা, যা সংক্রমণের হার মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দেওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচ্য । ব্যক্তির উপার্জন সক্ষমতা বিবেচনায় টোটাল জনসংখ্যার অধিকাংশ নিন্ম আয়ের মানুষ, যারা পেটের দায়ে নিত্য বাহিরে গিয়ে কায়িকশ্রমের সাথে সখ্যতা করতে বাধ্য হয়।

এ সমস্ত বিষয় রাষ্ট্রযন্ত্র অবগত থাকলেও উদ্দুদ্ধ পরিস্থিতিতে” সেফটি ফাস্ট” বা জনগণের জীবন রক্ষার ইস্যুতে হয়তো কঠোর লকডাউন দিয়েছে,যা সঠিক সিদ্ধান্ত বলেই বিবেচ্য এবং শাটডাউন দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহন করেছে। আলোচ্য লকডাউন ও শাটডাউনের বিষয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের উদ্যোগ শতভাগ সঠিক হলেও মানুষের আয়ের উৎস অবরুদ্ধ বিবেচনায় প্রতিবন্ধকতাও কম নয়।নিদিষ্ট মেয়াদে বা করোনা ভাইরাসের ম্যাচুর ওয়েভ টার্গেট করে কঠোর লকডাউন বা শাটডাউন দেওয়ার পূর্বে নির্ধারিত জেলাগুলোয় প্রান্তিক পর্যায়ে একান্ত নীডি কমিউনিটি ও নিন্মমধ্যবিত্তদের তালিকা প্রস্তুত করে ফান্ডামেন্টাল সাবসিডি প্রদান করতে পারলে এবং আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে লকডাউনের সুফল পাওয়া সম্ভব হতো।

সক্ষমতা বিবেচনায় আদৌ এমনটা বাস্তবায়ন করা কি রাষ্ট্রযন্ত্রের পক্ষে সম্ভব! যদি সম্ভব না হয়, তাহলে অসচেতন জনগণ ও ক্ষুধার্ত মানুষ জীবন বাচাতে সংরক্ষিত কক্ষে নিরাপদ না থেকে মৃত্যুর সাথেই নিত্য আলিঙ্গন করবে এবং লকডাউনের মর্মার্থ বাস্তবতার নিরিখে এদের নিকট তুচ্ছতাচ্ছিল্য মনে হবে। রাষ্ট্রযন্ত্রের নো মুভমেন্ট পলিসিতে জনস্বার্থে কঠোর নির্দেশনা পরিপালন ও প্রান্তিক মানুষের ক্ষুধামান্দ্যর যুদ্ধে উভয় পক্ষের কেউ হয়তো পুরোপুরি সফল হতে পারবেনা কিন্তু নির্দেশনার ব্যত্যয় ঘটলে সাইলেন্ট তৃতীয় পক্ষ হিসেবে মহামারি করোনার জয় হবে।

করোনার জয় মানেই আমাদের সকল প্রচেষ্টা, উদ্যোগ ও আন্তরিকতা অর্থহীন বলেই বিবেচ্য হবে। পরিবারের নিকটস্থ কাউকে হারিয়ে না ফেলার জন্য শত প্রতিকূলতার মাঝেও রাষ্ট্রযন্ত্রের কঠোর নির্দেশনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে আমরা নিজ আলয়ে অবস্থান করি। জানি ” প্রয়োজন আইন মানেনা “কিন্তু যে প্রয়োজন মৃত্যুকে অভিনন্দন জানায়, সেখান থেকে নিরাপদ দুরত্বে থাকাই শ্রেয় বলে প্রতীয়মান।

মোস্তাফিজুর রহমান। গোপালগঞ্জ। ২৬ জুন ২০২১.