এ যেন সম্পর্কের পরীক্ষা

মৃত্যুর ভয়ে তটস্থ সকল প্রাণী। মানুষও এটার ব্যতিক্রম নয়। তবুও মৃত্যুর সাথে লড়াই করে বাকশক্তি সামর্থ্যর অধিকারী মানুষের বেচে থাকার প্রত্যাশা অন্যান্য প্রাণীর চেয়ে অনেকাংশে বেশী। মায়া মমতার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে প্রতিটি মানুষের কল্পনাশক্তি তাকে লক্ষ্যে পৌছানোর প্রত্যয়ে আশাবাদী করে তোলে বিধায় মানুষ অন্তিম মুহুর্তেও পৃথিবীর একটু সজীব নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য উদগ্রীব থাকে। অর্থাৎ
” মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভূবণে,
মানবের মাঝে আমি বাচিবার চাই “।

সারা পৃথিবী জুড়ে চলছে অস্বাভাবিক ও অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর মিছিল। এই মিছিলে কে কখন যাত্রী হচ্ছে তার নিশ্চয়তা বিলীন করে দিয়েছে কোভিড -১৯। প্যানডেমিক প্যানিকে আক্রান্ত মানুষগুলো করোনা আক্রন্তের চেয়ে আতংকের আক্রান্তে বেশী ধরাশায়ী। প্রতি মুহুর্তে বেচে থাকার প্রত্যাশা নিয়েও করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে অগণিত মানুষ। প্রিয়জন হারানোর ব্যাথায় আমরা ব্যথিত হলেও এটা নিছক আপেক্ষিক ও সহজাত প্রবৃত্তি। এটা কিছু ক্ষেত্রে মানুষ দেখানো আর্তনাদও বটে। নিজ জীবনের কাছে মমতা যে তুচ্ছ, তা প্রমাণ করার জন্যেই বোধ হয় করোনার আগমন ঘটেছে।

করোনা আক্রান্ত রোগীকে বাচিয়ে রাখার তাগিদে রাষ্ট্রযন্ত্রের দৃশ্যমাণ উদ্যোগ ও ব্যবস্থা থাকলেও পারিবারিক আন্তরিকতা অনেক ক্ষেত্রেই নিষ্ঠুরতায় রূপ নিয়েছে। নিজকে সুরক্ষিত রাখার প্রত্যয়ে নিজ পরিবারের সদস্যরাও আক্রান্ত ব্যক্তিকে ফেলে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে। এখানে মমতা আর রক্তের বন্ধনের কার্যকরী ভূমিকা নিছক আপেক্ষিক ও অমানবিক চিত্রের দৃশ্যায়ন করছে। অর্থাৎ নিজ জীবনের নিরাপত্তাই এখানে অগ্রাধিকার পেয়েছে। বেচে থাকা অবস্থায় করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি তার আসল হিসেব মিলিয়ে নিয়েছে যে, জগত সংসারে নিজেই নিজের আপন ছাড়া অন্য কেই আপন হওয়ার সুযোগ নেই।
ঠিক আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুর পরে নিজ ছেলে মেয়ে ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা সৎকার করার প্রশ্নেও নিজ কথিত মমতার হাতকে গুটিয়ে নিয়ে স্বেচ্ছাসেবীদের উপরে ফেলে দিয়ে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শংকিত হচ্ছে। অথচ মেডিকেল সায়েন্স বলেছে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুর পরে ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা মোটেই নেই কিন্তু এই অন্ধ বিশ্বাসটুকু মনে প্রাণে লালন করে শেষ বিদায় টুকু দেওয়ার ক্ষেত্রেও আমরা ” চাচা আপন প্রাণ বাচা” ভূমিকায় অমানবিক আচরণ করে যাচ্ছি। এখানেই সম্পর্কের দৃশ্যমাণ পরীক্ষার ফলাফল চিত্রায়িত হচ্ছে।

আমিও মৃত্যুকে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি। তবে অস্বাভিক ও অকাল মৃত্যু প্রত্যাশা করিনা। চলমান পরিস্থিতিতে আমিও করোনা আক্রান্ত হতে পারি। ইমিউনিটি গ্রো করতে না পারলে হয়তো আমাকেও অপ্রত্যাশিত মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে হতে পারে। আমি আক্রান্ত হলে আমার সন্তান, স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের মমতার পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে নিরুৎসাহিত করছি। কারণ বেচে থাকার সাধ সকলেরই রয়েছে বিধায় তোমাদের এই আপেক্ষিক ও লোক দেখানো মমতা হয়তো আমাকে রক্ষা করার হাতিয়ার নাও হতে পারে, বা নিজ জীবন বিপন্ন করে আমাকে বাচিয়ে তোলার প্রচেষ্টায় ঋনী করে তোলার দায় আমাকে চাপিয়ে দিওনা। কারণ মৃত্যুর পরে এ দায় শোধ করার সুযোগ আমার অবরুদ্ধ হবে। অভিযোগ নেই তোমাদের প্রতি। কারণ তোমরা চলমান সামাজিক যে করুন চিত্র দেখে অভ্যস্ত হয়েছো, সেটাই তোমাদের উদ্দুদ্ধ করেছে বিধায় মমতা আর দায়িত্ববোধ তোমাকে হয়তো আমার পাশে দাড়াতে রেসপন্স করবে না। তোমার জীবন অন্যের মতোই তোমার কাছে প্রিয়।

সম্পর্কের পরীক্ষায় পরিবার ও সমাজের দায়িত্বশীল বিবেকবানেরা যেখানে বাচার তাগিদে রক্তের বাধন মুহুর্তেই মুছে দিয়ে নিজ নিরাপত্তার প্রশ্নে সীমারের ভূমিকায় পলায়ন করছে, সেখানে তোমাদের অবহেলায় হয়তো আমার কষ্টের পাল্লাটা এমন ভারী হবেনা। কারণ আমিও সমাজের দৃশ্যপট দেখেই শিক্ষা নিয়েছি। বরং তোমাদের নিরাপত্তা নিয়েই আমি শংকিত। কারণ আমি সন্তানের বাবা। আমার বিবেকবোধ ও দায়িত্ববোধ আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায় তোমাদের সুরক্ষিত করতে কিন্তু অভিযোগের তীরটি আমার দিকেই রাখি, যেন হাত ফসকে ধনুক থেকে তীর ছুটে গিয়ে আমার বুকেই বিধে। বিবেক আর মানবতা যেখানে প্রশ্নবিদ্ধ, সেখানে মমতা ও সম্পর্ক শব্দ দুটি অন্যের জীবনকে রক্ষার প্রচেষ্টায় অন্ধ।
সুরক্ষিত থেকো আমার রক্তে জড়ানো মানুষগুলো।
প্রেক্ষাপটই আমার আমিকে নিয়ে ভাবতে শিক্ষা দিয়েছে। সম্পর্কটার ইতিহাস এই মুহুর্তে বড়ই বেমানান ও নিষ্ঠুর। অকুতোভয় স্বেচ্ছাসেবী ও আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামই আমার রক্তের স্বজনের চেয়েও অন্তিম কালে প্রিয় বলে মনে হয়।

লেখক, কলামিস্ট মোস্তাফিজুর রহমান।
গোপালগঞ্জ।
তারিখঃ ০২/০৬/২০২০ ইং।